একজন আধুলি (উপন্যাস) পর্ব ১

অনেক দিন ধরেই

স্বজাতিদের ভারে আমার অবয়ব পুরােটাই ঢাকা পড়েছে। এই দুর্মূল্যের বাজারে আমার আধুলি মূল্যমান আর বাজারে বিকায় না। বাংলাদেশে আমাকে বদল করে আর কোনাে কিছুই দেওয়া- নেওয়া করা হয় না। মূল্যমানে অধিক নাদুসনুদুস স্বজাতি আমাকে অনেকটাই চিড়ে-চ্যাপ্টা করে ছাড়ছে। নতুন নতুন স্বজাতি প্রতিনিয়তই টুস করে গায়ে ধাক্কা খায় এবং একপর্যায়ে আমারই ওপর স্থায়ী সওয়ার হয়। এভাবেই একটি পুরােনাে কাঠ-বাক্সের মাঝে আমি স্থায়ীভাবে অচল হওয়ার প্রতীক্ষা করছি। এমন সময় একটি ঘটনা ঘটে যা আমাকে নতুন দিগন্তে সচল-যাত্রার সুযোগ করে দিল। একদিন অনেক রাত হয়ে গেছে আমার মালিক দোকান বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাঁর মুদিখানায় এর মধ্যেই বিক্রি কমে গেছে।

আরো পড়ুন: বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল

বিক্রি- বাট্টা প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় মালিক আরাম করে চায়ে চুমুক দিলেন। তিনি সারা দিনের বিক্রির টাকা গণনায় মনোেযােগ দিলেন। হঠাৎ এক নতুন ক্রেতা এলেন কথা শুনে মনে হলাে, তিনি খুব ব্যস্ত। একটা কোকের বােতল, এক ডজন ডিম ও দুই কেজি আলু কিনলেন। তারপর দাম পরিশােধের জন্য টাকার নােট দিলেন। আমার মালিক দামের বেশি টাকা ফেরত দিতে গিয়ে আমাকে খুঁজতে লাগলেন। কিছুক্ষণ স্বজাতিদের নাড়াচাড়া করে পেয়েও গেলেন এবং অন্যান্য টাকাসহ ক্রেতার হাতে আমাকে চালান করে দিলেন। আমি পুরােনাে মালিকের অন্ধ কটুরির বাক্স থেকে মুহুর্তের মধ্যে নতুন মালিকের হাতের তালুতে চলে এলাম। নতুন মালিক আমাকে দেখে কিছুটা কুঞ্চিত হলেন। খানিকক্ষণ ভেবে তাঁর কোটের ভেতরের বুকপকেটে চালান করে দিলেন। আমি কাঠের বাক্স থেকে নতুন মালিকের কোটের এক অন্ধকার পকেটে নতুন করে বন্দি হলাম। তবে সান্ত্বনা এই যে, এই মালিকের বুকপকেটে আমার অন্য কোনাে স্বজাতি নেই।

অন্য পোস্ট: বােরকার নিন্দা করবাে না

আমি একবারেই একা। অন্ধকার বুকপকেটে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়লাম। নতুন মালিক একটা রিকশা নিলেন। রিকশা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছে। আমাদের রিকশার পাশ দিয়ে ছাত্ররা মিছিল করে যাচ্ছে আর শ্লোগান দিচ্ছে, জামাত-শিবির রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’; ‘আমার ভাই মরল কেন, কর্তৃপক্ষ জবাব চাই’; ‘মুজিবের বাংলায় রাজাকারের ঠাই নাই’। আরও কত কী! মিনিট পাঁচেক চলার পর নতুন মালিকের বিকশা এক জায়গায় থামল। তিনি রিকশা থেকে নামলেন এবং ভাড়া মিটিয়ে দিলেন মালিক কয়েক পা এগিয়ে একটি কলিং বেল টিপলেন। বুঝলাম, তিনি বাসায় ঢুকছেন। দরজা খােলার শব্দ হলাে। তিনি ঢুকলেন। জুতা খুলে সােজা হেঁটে একটি ঘরে চলে এলেন। নারীকণ্ঠের আওয়াজ পাওয়া গেল। কথার ধরন দেখে বােঝা গেল নারীটি মালিকের সহধর্মিণী। নতুন মালিক ক্লান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।

অন্য পোস্ট: কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ৩)

কিছুক্ষণ একই ভাবে শুয়ে। রইলেন। কিন্তু মালিকের গিন্নির বারবার তাগাদায় বিছানা থেকে উঠে গায়ের কোটটা একবারে আলনায় শেষপ্রান্তে রেখে দিলেন। মালিকের কোটসমেত আমি ঘরের এক কোনায় আশ্রয় নিলাম। এ এক নতুন ঠিকানা। সুনসান নীরবতা, দোকানের কোলাহল নেই। নিজের অবস্থান নিয়ে স্বজাতির সঙ্গে ঠাই-ঠাই ভাব নেই। মনে মনে খুশিই হলাম। সমগ্র পকেট ঘরটাই এখন আমার। কেউ এখানে ভাগ বসাতে আসবে না। প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারব। কিছুক্ষণ পর নতুন মালিক তাঁর গিন্নির সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন। কথার সারমর্ম হলাে, নতুন মালিক উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-১

গিন্নি তাঁর সঙ্গী হচ্ছেন না। কারণ তিনি সরকারি চাকুরি করেন। ফলে মালিকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ছায়াসঙ্গী হওয়ার সুযােগ উনার নেই। তা ছাড়া তাদের পাঁচ বছরের কন্যাকে অনেক কষ্ট করে একটি নামিদামি স্কুলে ভর্তি করানাে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ গিয়ে বসবাসের সুযােগ নিলে স্কুলে ভর্তি বাতিল হবে। অতএব, নতুন মালিক একাই যাচ্ছেন। আমি কান পেতে শুনছিলাম। তিনি বিদেশে যেখানে যাচ্ছেন, সেটি হচ্ছে ইউরােপের ফিনল্যান্ড। মালিকের গিন্নি একাধারে বকে যাচ্ছেন, ফিনল্যান্ড খুব ঠান্ডা জায়গা। শীতে প্রচুর বরফ পড়ে। তাই তিনি তার স্বামীর ঠান্ডালাগা নিয়ে খুবই শঙ্কিত। এত শীতের দেশে কীভাবে ঠান্ডা থেকে দূরে থাকবেন তারই ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছিলেন। নতুন মালিক শুধু শুনেই যাচ্ছেন আর কিছুক্ষণ পর পর ‘হ্যা’ বলে যাচ্ছেন।

অন্য পোস্ট: একজন আধুলি (উপন্যাস) পর্ব ২

আলাপচারিতার একফাকে মালিকের মেয়েটা হঠাৎ কান্না শুরু করে দিল। গিন্নি-মালিক মেয়েকে কোলে নিয়ে শি শি করে শব্দ করলেন। মেয়েটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বহিরম করতে শুরু করল। বাথরুম শেষে তিনি মেয়েকে নিয়ে ঘুমপাড়ানি ছড়া কেটে তাকে আবার ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তার ঘুমপাড়ানি গানে মেয়েটা একপর্যায়ে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল। গিন্নি-মালিকের গান আমাকেও আলােড়িত করল। আমি নতুন মালিকের ঘরে নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে ঘুম দেবতার শরণ নিলাম। আহা শান্তির ঘুম! কোনাে স্বজাতির কোনাে গুতােগুঁতি বা ঠেলাঠেলি নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *