একজন আধুলি (উপন্যাস) পর্ব ২

আমার প্রতি ইউরাে-বন্ধুর

এই খোঁটা দেওয়ার স্বভাবটা গেল না। সুযােগ পেলেই আমি যে তার চেয়ে হীন এবং নিচু এটা সে নানা ফন্দি-ফিকির করে বলতেই থাকে। আসলে মানুষের সঙ্গে থেকে, তার কেটস্থ হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের খোঁটা দেওয়ার স্বভাবটা সে বেশ সুন্দরভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছে। কিন্তু আমিও তাে মানুষের পকেটে পকেটে সারা জীবন ধরে ঘুরেছি। আমার মধ্যে তাে তার মতাে বড়লােকি ভাব তৈরি হয়নি। কিন্তু তার কেন হলাে? এই প্রশ্নটা আমার মাথায় বেলই ঘুরপাক খাচ্ছে। কীভাবে কথাটা তাকে বলি । এটা চিন্তা করতে করতে আমার ধাতব কপাল কুঞ্চিত হয়ে গেছে। ইউরে-বন্ধু হঠাৎ আমার দিকে পাশ ফিরে শুল। আমার কুঞ্চিত কপাল দেখে বলল, আধুলি বন্ধু, বিজ্ঞের মতাে কপাল কুঁচকেছ কেন ? আচ্ছা, তুমি আমাকে সব সময় এত অবজ্ঞা করাে কেন? তা কেমন ? এই যে, কথায় কথায় তুমি বলে ওঠো, তুমি আমার চেয়ে জ্ঞানী, বিজ্ঞ, পণ্ডিত, আকর্ষণীয় ইত্যাদি আর কী! বুঝেছি, আর বলতে হবে না।

বলেই সে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়ল। তার মুখে কোনাে রা নেই। অনেকক্ষণ পর সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা আধুলি বন্ধু, তুমি কি কখনাে কাউকে হেয় বা অবজ্ঞা করােনি ? কই, মনে তাে পড়ছে না, আমি আমার এই ক্ষুদ্রজীবনে কখনাে কাউকে অবজ্ঞা করেছি। মনে করে দেখাে, এমনকি তােমার দেশে তােমার চেয়েও ছােটমানের কয়েনকে ? তার এই কথায় আমি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। হ্যা, তাই তাে। দেশে থাকতে পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, এমনকি সিকি পয়সাকে পাত্তাই দেইনি। কারণ তারা আমার চেয়ে ছােটমানের ছিল। এগুলােকে দিয়ে একসময় আমার চেয়েও কম দ্রব্য পাওয়া যেত | শুধু তাই নয়, গত বছর দশেক ধরে দেশে এদের কোনাে অস্তিত্ব নেই। ভেলকিবাজির মতাে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। এদের চেহারাটা আমার মনের মধ্যে স্পষ্ট করতে চাইলাম। চোখটা ভিজে গেল। কান্না চলে। এসেছে। কোথায় চলে গেল এই অভাগা মুদ্রারা ? আচ্ছা, আমিও কি তাদের মতােই হারিয়ে যাব ? ইউরাে-বন্ধুর ধাক্কায় আমি দুঃখের স্মৃতি থেকে নিরেট বাস্তবে ফিরলাম।

অন্য পোস্ট: একজন আধুলি (উপন্যাস) পর্ব ১

বললাম, বন্ধু, দুঃখিত

আজ তুমি আমার প্রতি যে আচরণ করছ, একসময় আমিও আমার চেয়ে কম মানের স্বজনদের প্রতি কথায় কথায় তার বারুদ ছুড়ে দিতাম। তাদের মূল্যবান মুদ্রা বলে স্বীকার করতে চাইতাম না। তাহলে আধুলি বন্ধু, শুধু আমিই নই, তুমিও মানুষের আচরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের মতােই ঈর্ষাকাতর হয়েছ। মনােযােগ দিয়ে শােনাে, পৃথিবীতে কেউই তার নিজের ক্রটি বা ভুলকে ধরতে পারে না, যদি না তা অন্য কেউ ধরিয়ে দেয়। সেই সাথে আরেকটা কথা মনে রেখাে, আমাদের। স্রষ্টা মানুষেরা এই পৃথিবীতে অনেক প্রভাবশালী প্রাণী। অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি। একমাত্র এই পৃথিবীর অধীশ্বর ছাড়া তারা সৃষ্টিজগতের সকলকে শুধু প্রভাবিতই করে না, এদের সকলকে পদানতও করে। এটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আমি ইউরাে-বন্ধুর কথা সবটা যে মনােযােগ দিয়ে শুনলাম, তা কিন্তু নয়।

বরং আমি হারিয়ে যাওয়া আমার চেয়ে ক্ষুদ্রমানের মুদ্রাগুলাের সঙ্গে। ঘটে যাওয়া স্মৃতিসাগরে অবগাহন করছিলাম। আহা, একসময় ওরা আমার সহযাত্রী ছিল। মানুষের পকেটে করে একস্থান অন্যস্থানে। নিত্য ভ্রমণ করত। কিন্তু এখন তারা মহাকালের অংশ হয়ে গেল। কোনােভাবেই কি তাদের আবার এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় না? এক বছর হতে চলেছে আমি ময়লা পানির নালা থেকে বিচ্যুত হয়ে ভূগর্ভস্থ ময়লার এক স্থায়ী গহ্বরে আশ্রয় পেয়েছি। এখন আর আমাকে আধুলি বলে চেনা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে আমার ওপর মানুষের মল-মূত্রের প্রলেপ পড়ার কারণে আমি এখন দুর্গন্ধময় একটি ময়লার স্তুপে পরিণত হলাম। আমার এই রূপান্তর মৃত্যুরই আরেক নাম । আহা! সাধের আধুলি- জীবনের বিলয় ঘটেছে। এই ঘাের বিপদের দিনে হঠাৎ আমার ইউরাে- বন্ধুর কথা মনে পড়ল। সে হয়তাে কখনাে কোনাে অবস্থাতেই আমার মতাে করুণ বিলদশায় উপনীত হবেনা। এখনাে হয়তাে সে আমার মালিকের কেবিনেটের ড্রয়ারে পরম যত্নে নিদ্রা যাচ্ছে। হয়তাে আমাকে ইতিউতি করে খুঁজে চলেছে।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-৩

কিন্তু না পেয়ে

আবার চরম নিঃসঙ্গতায় ডুবে যাচ্ছে হয়তােবা। তবে এটাও ঠিক, আবার কখনাে নিজ দেশে ফিরে গেলে তাকে দিয়ে সেখানকার জার্মান মালিকেরা অন্তত এক হালি চকলেট তাে কিনতে পারবে। মনে পড়ছে, ফাইল কেবিনেটের নিচে আমি যখন আটকা পড়েছিলাম, তখন চেয়েছিলাম ধূলির আস্তরণ থেকে মুক্ত হয়ে ভেতরে রক্ষিত ড্রয়ারে ইউরাে-বন্ধুর পাশে জায়গা পেতে । কিন্তু ভাগ্যচক্রে আমার স্থান নির্ধারিত হয়েছে মালিকের বিল্ডিংয়ের পেছনে ময়লা পানি নির্গমনকারী নালার নিচে এক স্থায়ী ভূগর্ভস্থ গহ্বরে। তাও আমার নিজের দেশে! এটিই ছিল আমার নিয়তি। হয়তাে পরমেশ্বরের নির্দেশেই আমার ভাগ্যে তা নির্ধারিত হয়েছে। ভালােই হলাে! নিজের দেশের মানুষের কাছে অসম্মানিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুই বরং কাম্য। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি যখন কাজের মেয়ে আয়েশাও আমাকে দেখে রক্ষা করার কোনাে চেষ্টাই করে নি।

আমার প্রতি কোনাে আগ্রাই দেখায়নি। মূল্যহীন মুদ্রার ভার কে বহন চায় ? সে তাে বাগানের পচে যাওয়া আমটির মতাে যাকে ফেলে দিতে পারলেই স্বস্তি পাওয়া যায়। হয়তাে আমার চেতন জীবনের শেষ দিন হতে যাচ্ছে আজ। তারপর কোনাে নিকট মুহূর্তে আমি ময়লা আবৃত এক পিণ্ডে পরিণত হব। এটাই হয়তাে আমার মুদ্রা-জীবনের মৃত্যু। বুঝতে পারছি, সবর্দা ঘুরে বেড়ানাে আমার বােহিমিয়ান চেতনা যেন একটু একটু করে লােপ পেতে যাচ্ছে। স্মৃতিতে ভর করে এই ক্ষুদ্র জীবনে ঘটে যাওয়া ভালাে কিছু স্মরণ করতে চাইলাম। কিন্তু মনে পড়ছে, আমার এই আধুলি-জীবনে কোনাে মালিকের কাছ থেকে প্রকৃত অর্থে কোনাে আদর পাইনি। সােহাগভরে কেউ আমাকে হাতের মুঠোয়ও পুরে নেয়নি। কিন্তু আমার ইউরাে-বন্ধু বিদেশি হয়েও ঠিক তা আদায় করে নিতে পেরেছে, এমনকি বিদেশি বাঙালি মালিকের কাছ থেকেও। ধূসর স্মৃতির ভেলায় ভেসে হঠাৎ মনে পড়ে গেল একজন বাঙালি কবির কথা। নাম তাঁর নির্মলেন্দু গুণ। তিনি নাকি তাঁর লিখিত এক কবিতায় আমার প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন।

আমার শেষ মালিক, যার কোটের পকেটে করে ইউরােপ যাত্রা করে এলাম, তিনি কবিতা পড়তে ভালােবাসতেন। ফিনল্যান্ডে অবস্থানকালে একদিন তিনি শব্দ করে কবি গুণের সেই কবিতাটা আবৃত্তি করছিলেন। আর আমি তাঁর কোট-পকেটে থেকেও সেটা শুনেছিলাম। তার আবৃত্তি থেকে বুঝেছিলাম, এই কবিতায় কবি গুণ আমাকে শ্রমিকদের কাছে ঈশ্বরতুল্য বলেছেন। সবগুলাে লাইন। আমার স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও মালিকের আবৃত্তি করা দুটি ছত্র এখনাে ভুলতে পারছি না। কারখানার এক শ্রমিক দিন শেষে আমাকে হাতের কাছে পেয়ে বলছে- দিনের কাজের শেষে একটি আধুলি পাই হাতে ভালােবেসে পুজো করি, তাকেই ঈশ্বর ভাবি রাতে। মালিকের মুখে গুণের এই কবিতা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। শ্রমিকেরা আমাকে এত মূল্য দিয়েছে! কই, আমার সুস্থ জীবনে যখন মানুষের হাতে, পকেটে করে বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি, তখন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *