কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ২)

মিসওয়াক

মিসওয়াক নিয়ে রুস্তম সাহেবের আগ্রহ দেখে ভালাে লাগছে। আমি আমার হাতের মিসওয়াকটা দেখিয়ে বললাম, মিসওয়াক ডান হাতে ঠিক এই ভাবে ধরতে হয়। ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল মিসওয়াকের নিচে এবং মধ্যমা ও তর্জনী মিসওয়াকের ওপরে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে এর মাথার নিচটা এই ভাবে চেপে ধরতে হবে। এই ভাবে ধরেই কি আমাদের নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁত মাজতেন? ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব। আপনি পরীক্ষায় ১০০ তে ১০০ পেয়েছেন। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক এভাবে ধরেই দাঁত মাজতেন। রুস্তম সাহেবের হলদেটে চোখ রােমাঞ্চতে চক চক করছে। তিনি বললেন : হুজুরদের মেসওয়াক করতে দেখতাম কিন্তু এত ডিটেইলে ব্যাপারটা জানতাম না। ইসলামের ছােট ছােট ব্যাপারগুলাে থেকে শুরু করে বড় বড় গুরুগম্ভীর বিষয়গুলাে আপনি যত ডিটেইলে জানবেন, ইসলামের প্রতি ইন্টেরেস্ট আপনার ততই বাড়তে থাকবে।

আরো পড়ুন: বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল

যদি না আপনার হৃদয়ে মােহর মারা থাকে। মােহর মারা লােকজনের শেষ গন্তব্য প্রজ্বলিত অগ্নি, আই মিন জাহান্নাম। রুস্তম সাহেব ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি জানি। তবে আপনার তাে ভয়। নাই। কেন? আমার ভয় নাই কেন? আপনি সঠিক মানুষ। আমি সঠিক মানুষ আপনাকে কে বলল? রাত-বিরেতে মাসজিদের বারান্দায় পরে থাকলেই মানুষ সঠিক হয়ে যায়? চোর-বাটপারও অনেক সময় মসজিদের বারান্দায় গা ঢাকা দেয়। রুস্তম সাহেব এবার মাথা নিচু করে ফেললেন। সম্ভবত তিনি আর কথা বলবেন । একদিনে অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছেন। তার সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালাে লাগছে। ভদ্রলােক এক দেড় বছরের ওপর আমার পাশের ঘরে আছে। এই পুরাে সময়ে তার সঙ্গে আমার তিন-চার বারের বেশি কথা হয়নি। সেই সব কথাও কেমন আছেন রুস্তম সাহেব?’ ‘এই আছি’—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ভদ্রলােক কী করেন? এ ছাড়া মুসলিম হিসেবে অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে। তাহলে আল্লাহর কাছাকাছি থাকা যাবে। আর নিজের রবের কাছে থাকলে তিনিই সব ঠিক করে দেবেন ইন শা আল্লাহ…। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়? মাঝে মাঝে দু-এক ওয়াক্ত মিস হয় ভাই।

তবে আমার মেয়ে এখন নামায পড়ে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে। বেশ সময় নিয়ে পড়ে। সে পর্দা করছে, খাস পর্দা। আগে শুধু হিজাব পরত, এখন নিকাবও করছে। আলহামদুলিল্লাহ। এটা তাে অনেক ভালাে কথা। শুনুন ভাই, আপনিও পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে আদায় করা শুরু করুন, আর ফরয নামাজের পর আপনার মেয়ের জন্যে দুআ করুন। আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন। ইন শা আল্লাহ। রুস্তম সাহেব আগের মতাে কোমল গলায় বললেন, ঠিক আছে। তারপরও আপনি একটু দোয়া করবেন আমার মেয়েটার জন্যে। অনেকদিন বলার চেষ্টা করেছি। সাহস পাইনি। আজ আল্লাহ পাক সুযােগ দিয়েছেন। আমি হাসতে হাসতে বললাম, ঠিক আছে, দোয়া করলাম। আল্লাহ যেন অনন্য- সাধারণ গুণবান এবং দ্বীনদার ছেলের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন। তারা যেন দুনিয়া এবং আখিরাতে সফল হয়। রুস্তম সাহেব ক্ষীণ গলায় বললেন, আপনাকে অসংখ্য শুকরিয়া। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে পীর-ফকিরের মতােই গম্ভীর ভঙ্গিতে নিচে নেমে গেলাম। ভালাে যন্ত্রণা হয়েছে। আমাকে অলৌকিক ক্ষমতাধর মনে করে—এমন লােকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। দুষ্ট বুদ্ধি থাকলে রমরমা পির-ব্যবসা খুলে বসা যেত। একটা খানকাহ খুলে বসলে ইনকামও হতাে বেশ। কমন বাথরুমটা নিচে।

অন্য পোস্ট: বােরকার নিন্দা করবাে না

এই সময় কেউ ওঠেনি। বাথরুম খালি পাওয়া যাবে। ভালাে মতাে অজু করে নিতে হবে। অজুর মাঝখানে কুলি করার আগে আরেকবার মিসওয়াক করতে হবে। কোথায় যেন শুনেছিলাম অজুর সময় কুলি করার আগে মিসওয়াক করা উত্তম। অবশ্য এটা আমার শােনা কথা, ক্রস চেক করা হয়নি। মুসলিমদের যেকোনাে আমাল করার আগে সেটা সম্পর্কে ভালাে করে জেনে নেয়াই উত্তম। আজকে ফজরের সালাতের পর রায়হানের সাথে দেখা করতে যাব। সে গত এক সপ্তাহ ধরে দু-দিন পর পর আমার কাছে আসছে। কখনাে দেখা হচ্ছে না। সে এমন সময় আসে যখন আমি থাকি না। আমি থাকলে সে আসে না। তার ব্যাপারটা কী, কে জানে! বাথরুমের বেসিন অনেক দিন ধরেই ভাঙা। আজ দেখি নতুন বেসিন। বেসিনের ওপর নতুন আয়না। মেসের মালিক মােনায়েম খাঁ সাহেব কিপ্টামির চূড়ান্ত করেছেন বলে মনে হচ্ছে। বেসিনের কাছে না গিয়েই বলতে পারছি কোন রিজেক্টেড বেসিন এনে ফিট করে দিয়েছেন। সিরামিকের বেসিন ঠিক আছে কি না সেটা পরীক্ষা করার একটা উপায় আছে, এক টাকার একটা কয়েন নিয়ে বেসিনের ওপর হালকা করে বাড়ি দিলে যেই বেসিন টন টন করে উঠবে, বুঝতে হবে সেটা ঠিক আছে। আর যেটা চা চাঁ করে শব্দ করবে সেটায় চোখে না দেখা গেলেও সূক্ষ্ম ফাটল আছে বুঝতে হবে। আমার হাতে পয়সা নেই৷ থাকলে মােনায়েম খাঁ সাহেবের বেসিনটা চ্যাঁ ভ্যাঁ করেই চ্যাঁচাত।

অন্য পোস্ট: কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ৩)

খাঁ সাহেব আয়নাটাও যেটা লাগিয়েছে, সেটাও একটা ইতিহাস। অসংখ্য ছােট ছােট দানা রয়েছে। আয়নার ভেতরে। এই আয়না দিয়ে মুখ দেখতে পাওয়ার কোনাে কারণ নেই। আয়না দেখলেই আয়নার সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। খুবই ক্ষুদ্র ইচ্ছা এবং নির্দোষ ইচ্ছা। তবু নাফসকে সামলাতে এসব ইচ্ছাকে সব সময় প্রশ্রয় দিতে নেই। একবার প্রশ্রয় দেয়া শুরু করলে, পরে বড় বড় দোষের ইচ্ছাগুলােও প্রশ্রয় দিতে মন চাইবে। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মত। শয়তান প্রথমে নির্দোষ, নিরামিষ ইচ্ছা দিয়ে নাফসকে প্রলুব্ধ করে, যখন মানুষ এগুলাে প্রশ্রয় দেয়া শুরু করে, তখন শয়তান আস্তে আস্তে বড় কিছু এবং গুনাহর কিছু ইচ্ছাকে পূরণ করতে নাফসকে প্রলুব্ধ করতে থাকে। মানুষ যেহেতু হারাম-হালালের মাঝখানের ছােট ছােট ইচ্ছা পূরণ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, একসময় গুনাহ-মিশ্ৰিত ইচ্ছাগুলােও সে অবলীলায় পূরণ করতে থাকে। তখন আর তাঁর মনের ভেতর কোনাে অনুশােচনা থাকে না। পাপ-পুণ্যের অনুভূতি থাকে না। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ না করতে। কারণ, শয়তান হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে একজন মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। যদিও আয়না দেখা কোনাে গুরুতর অপরাধ নয়; বরং এটা সাধারণ বৈধ কাজ। কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের মানুষের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে যদি সারাক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকা হয়, তাহলে সেটা অবশ্য বেশ ভয়াবহ ব্যাপার।

আমি পুরুষ মানুষ

সাধু-সন্ন্যাসী না যে বৈরাগ্য নিয়ে বসে আছি। তা ছাড়া বৈরাগ্যবাদ অনুসরণ করা ইসলামে অনুমােদিতও নয়। এখনাে বিয়েটা পর্যন্ত করতে পারিনি। রায়হানের কাছে যাব বলে ভেবেছিলাম, তার প্রয়ােজন হলাে না। ফজরের নামায আদায় করে এসে দেখি রায়হান বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অত্যন্ত সুপুরুষ একজন মানুষ। আমার ধারণা সে হেঁড়া শার্ট আর ময়লা লুঙ্গি গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে রাজপুত্রের মতাে লাগবে। ইসলাম প্র্যাকটিস করতে শুরু করেছে সঠিকভাবে। সেইভ করা বন্ধ করেছে অনেক দিন হলাে। এখন দাড়ি বড় হয়েছে, গােফ হালকা হেঁটে নিয়েছে। অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি আনন্দিত গলায় বললাম, কী খবর রায়হান? রায়হান একবার আমার দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। জবাব দিল না। চুপ করে রইল। প্রশ্ন করলে সে জবাব দিতে ঠিক পছন্দ করে না। হু হা দিয়ে কাজ সারে। এটা তার স্বভাব।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-১

ইদানীং কোনাে বড় সমস্যায় আছে মনে হচ্ছে, কোনাে প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছে না। প্রশ্ন করলেই গম্ভীর হয়ে থাকছে। মাঝে মাঝে প্রশ্নের উত্তরে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে। সে কোনাে বড় সমস্যার মধ্যে থাকলে এখন কথা বলতে চাইবে না। টেকনিকে ওর কাছ থেকে কথা বের করে আনতে হবে। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, দাঁড়া কাপড়টা একটু চেইঞ্জ করে নেই। তারপর চল ঢ খাব, আচ্ছা তুই যে কয়েকবার আমার খোঁজ করলি কারণটা কী? রায়হান চুপ করে রইল। চুপ করে থাকবে জানা কথা। সে এখন খুব কম কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। আমি কাপড় ছাড়লাম। জোব্বা-পাগড়ি পরতে পরতে বিরক্ত গলায় বললাম, কাঠের মতাে দাঁড়িয়ে থাকলে তাে কোনাে লাভ হবে না। কিছু বলার থাকলে বলে ফেল। রায়হান থমথমে গলায় বলল, সজলের কথা মনে আছে? কোন সজল। ওই যে বর্তমান তেল ও জ্বালানি মন্ত্রীর পুত্র। তাের বন্ধু। ও, মনে পরেছে। কলেজে থাকতে কোনাে এক মেয়ের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সিলিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *