কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ১)

আমার অস্বস্তি বােধ হচ্ছে

দুই হাতের ওপর শরীরের সব ওজন দিয়ে এই ভাবে ঝুলে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। কিছুক্ষণ আগেও পায়ের নিচে মাটি ছিল। মাটি বললে ভুল হবে, বলা যায় পাথর ছিল–সবুজ পাথর। আমার ভর ধরে রাখতে না পেরে ভেঙে পড়ে গেছে। পাথর ভেঙে ঠিক কোথায় পড়েছে তা দেখার উপায় নেই। আমি এত উঁচুতে আছি যেখান থেকে জমিন দেখা সম্ভব নয়… শুনেছি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে উঠলে নিচে সাদা মেঘের কারণে মাটি দেখা যায় না। এখানে কোনাে মেঘ নেই। দৃষ্টিশক্তি যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেখানে অসীম অন্ধকার। এটাও একটা অস্বস্তির কারণ। এখান থেকে যদি, আল্লাহ না করুন, পড়ে যাই, তাহলে কোথায় গিয়ে প্রব সেটাও বুঝতে পারছি না। সবুজ গাত্রবর্ণের এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হবে। পাহাড়টা রেডিয়ামের মতাে জ্বলজ্বল করছে, চূড়া দেখা যাচ্ছে। কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে—কে সে? কানের কাছে ফিস ফিস শব্দ শুনতে পাচ্ছি কেউ একজন বলছে, উঠে আয়, দ্রুত উঠে আয়, দ্রুত।

আমি কি উঠতে পারব

একজন একজন করে চূড়ায় উঠছে আর পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমিই শুধু দুই হাতের ওপর ভর করে কায়দা করে ঝুলে আছি। পায়ের নিচে মাটি পাচ্ছি না। আচ্ছা, আমি এই সবুজ পাহাড়ে এভাবে কেন। ঝুলছি? আর ওই লােকটা পাহাড়ের চূড়া থেকে আমাকে এভাবে কেনই-বা ডাকছে? কিছুই তাে বুঝতে পারছি না। এটা কি কোনাে স্বপ্ন? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? পাহাড়টার চূড়ায় ওঠার কৌতূহল আটকে রাখতে পারছি না। আমি চূড়ােয় উঠতে চাই। সেখানে কী আছে দেখতে চাই। দু-হাত ব্যথা করছে ঝুলে থাকার কারণে। সারা শরীরে মাধ্যাকর্ষণের প্রচণ্ড টান অনুভব করছি। হাত ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে ওই মানুষটা আবারও চিৎকার করে বলছে, উঠে আয় জলদি, উঠে আয়। আমার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, কে তুমি? কে? আমি কিছুই বলতে পারছি না। আমার অস্বস্তি বােধ হচ্ছে। মনটা খারাপ লাগছে। বুঝতে পারছি এটা স্বপ্ন। তবুও স্বপ্নটাকে শেষ পর্যন্ত দেখতে ইচ্ছা করছে। পাহাড়ের চূড়ােয় উঠে কীভাবে পাখি হওয়া যায় সেই প্রসেসটা জানতে ইচ্ছে করছে। পাহাড়ের চূড়ােয় কে দাঁড়িয়ে আছে সেটাও জানা দরকার।

কিন্তু ঝুলে থাকায় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অস্বস্তির মাত্রা বাড়ছে। সারা শরীর যাচ্ছে ঘেমে। ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ঘুমের মধ্যেই ছটফট করতে করতে আমি জেগে উঠলাম। ঘরের বাতাস গরম হয়ে আছে। দরজা-জানালা বন্ধ। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে। ইদানীং এডিস মশা শুরু করেছে ব্যাপক যন্ত্রণা। আগে ডেঙ্গু নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াত, এখন ডেঙ্গুর সাথে সাথে চিকনগুনিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ডেঙ্গু নামটা তাও সভ্য ছিল, চিকন গু.. নিয়া … কেমন অসভ্য একটা নাম। আমার সমস্যা হলাে ‘গু’ শব্দটা শুনলেই আমার বিশেষ বর্জ্যের কথাই মাথায় আসে। এই রােগের নামে শুধু যে ‘গু’ আছে তা-ই না, এর সাথে আবার চিকন ও আছে … চিকনগুনিয়া। কী অদ্ভুত অসভ্য নাম! এই জ্বর হলে নাকি প্রচণ্ড শরীর ব্যথা করে। শরীরের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা হয়। আমি বাতি জ্বালালাম। কাঠের আলমারির দরজাটা খােলা। সেটায় টক টক শব্দ হচ্ছে। প্রায়ই হয়। কিসের শব্দ আমার জানা নেই। অনেকে বলে কাঠ জীবিত থাকে, তাই এমন শব্দ করে। এই কথারও কোনাে ভিত্তি আছে কি না আমি জানি না। সুতরাং এসব নিয়ে চিন্তা করা বৃথা। আমার ঘরে কোনাে ঘড়ি নেই। সময় দেখতে হলে বাইরের আকাশ দেখতে হবে।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-১

আমি উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যাবে অল্প পরেই। আজকে অনেক বেশি ঘুমিয়েছি। রাতের নামাজ আর ঠিকমতাে পড়া হলাে না। তাহাজ্জুদ পড়তে পারাটাও আল্লাহর দেয়া একটা নেয়ামত। সবাই চাইলেই আদায় করতে পারে না। আল্লাহর ইচ্ছা লাগে। একজন সালাফ বলেছিলেন, কোনাে গুনাহ করলে আল্লাহ তা’আলা আমাকে ছয় মাস তাহাজ্জুদ পড়া থেকে বঞ্চিত করতেন। হয়তাে গুনাহের কারণেই ববের সামনে দাঁড়ানাের তৌফিক হচ্ছে না। আমি বেরিয়ে এলাম বারান্দায়, পাশের ঘরের রুস্তম সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁতে কয়লা ঘষছেন। এই লােক কয়লা দিয়েই দাঁত মাজেন। পেস্ট-ব্রাশ কখনােই ব্যবহার করেন না। পেস্ট দিয়ে নাকি দাঁত পরিষ্কার হয় না। ধীরে ধীরে আরও হলুদ হয়। একসময় দাঁতের চিকনগুনিয়া হয়ে যায়। এই শহরে দাঁত মাজতে এত কয়লা সে কই পায়, সেটাও একটা রহস্য। রুস্তম সাহেব আমাকে আসতে দেখে কয়লামাখা দাঁতে মিহি করে হাসলেন। তার চোখ হলদেটে। এটা কোনাে নতুন ব্যাপার না। রুস্তম সাহেবের চোখ সব সময়ই হলদেটে।

কী ব্যাপার আব্দুল্লাহ ভাই? ফজরের ওয়াক্ত হতে তাে এখনাে সময় বাকি। এত আগে উঠেছেন ব্যাপার কী? মে ঘুম ভেঙে গেল। দাঁত মাজবেন ভাই সাহেব? রুস্তম সাহেব আমার দিকে বাঁ হাতে ধরে রাখা দুটা কয়লার টুকরাে এগিয়ে দিলেন। আমি হাসিমুখে পকেট থেকে আমার বিখ্যাত মেসওয়াকটা বের করে দাঁতে ঘষতে শুরু করলাম। এই মেসওয়াক যেনতেন মেসওয়াক না, যয়তুন গাছের মেসওয়াক। আরব থেকে আনা। আইশার বাবা সরাসরি আনিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে তিনি প্রায়ই এই জিনিস আমাকে উপহার হিসেবে দিচ্ছেন। হবু শ্বশুরের কাছ থেকে এমন উপহার পেতে আমার অবশ্য খারাপ লাগছে না। রুস্তম সাহেব সরু চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। বারান্দার হলুদ আলাের কারণেই তাকে আজ অনেক কমবয়স্ক মনে হচ্ছে। ভদ্রলােকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাকে দেখে আমার সব সময় মনে হয়েছে তার গায়ের ভেতরের রস কেউ আচ্ছা করে চেপে বের করে নিয়েছে। কুঁজো হয়ে হাঁটেন। চোখে চোখ পড়লে অতিরিক্ত আন্তরিকতায় চোখ নামিয়ে নেন।

অন্য পোস্ট: কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ৩)

রাস্তায় দেখা হলে যদি জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন রুস্তম সাহেব? তিনি বিব্রত গলায় কোনাে রকমে বলেন, এই তাে… আছি। ছুটির দিনগুলােতে ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন। মেসে যেদিন ভালাে খাবার রান্না হয়, সবাই বেশ আয়েশ করে একসাথে খায়। তিনি বাইরে থাকেন। সবার খাওয়া শেষ হবার পর, একফাঁকে তিনি চুপি চুপি খেতে যান। দেখলে মনে হবে চুরি করে খাচ্ছে। মাথা নিচু করে অতি দ্রুত খাবার-পর্ব শেষ করেন। যত দ্রুত শেষ করা যায়, ততই ভালাে—এমন ভাব। এই লােক আমাকে দেখে এতগুলাে কথা বলবে, দাঁত মাজার জন্যে কয়লা এগিয়ে দেবে, ভাবাই যায় না। আমি তার দিকে খানিকটা এগিয়ে। গিয়ে বললাম, ভাই সাহেব, আমার কয়লা দিয়ে এত কসরত করে দাঁত মাজতে ভালাে লাগে না। মেসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজায় আরাম হয়। গাছের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার হয়? অবশ্যই হয়। তবে কোন গাছের ডালকে মেসওয়াক হিসেবে ব্যবহার করছেন এটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই নাকি? জি। মিসওয়াক হিসেবে সব থেকে ভালাে হলাে যয়তুন গাছের ডাল, নিম গাছের ডাল দিয়েও মেসওয়াক হয়। গাছের ডাল ভেঙে দাঁতে ঘষলেই মেসওয়াক করা হলাে । সঠিকভাবে মেসওয়াক ব্যবহার করতে পারাটাও শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। অ্যা। রুস্তম সাহেব অদ্ভুত এক শব্দ করলেন। তার মুখ হাঁ হয়ে আছে। এর অর্থ তিনি কথা গিলছেন। কেউ কথা গিললে কথা বলতে আরাম হয়। আমি উৎসাহ নিয়ে বললাম, মিসওয়াক হতে হবে কমপক্ষে কনিষ্ট অঙ্গুলির মতাে মােটা। এক বিঘত পরিমাণ। লম্বা এবং নরম ও কাচা হওয়া সর্বোত্তম। আর খেয়াল রাখতে হবে, যে ডালকে মেসওয়াক বানানাে হচ্ছে সেটা যাতে কম গিরাসম্পন্ন হয়। মিসওয়াক ধরারও কিন্তু বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। বলেন কী!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *