কারাগারে সুবোধ উপন্যাস আলী আব্দুল্লাহ (পর্ব ৩)

ফ্যানের সাথে ঝুলে

জীবন দিতে গিয়ে সিলিং ফ্যান নিয়ে মাটিতে পরে কেলেঙ্কারি বাঝিয়েছিল। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস। কী হয়েছে ওর? ওকে দ্বীনের দাওয়াহ করছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ সজলের অনেক পরিবর্তন এসেছে। আল্লাহর ইচ্ছায় ইসলাম প্র্যাকটিস করা শুরু করেছে। আলহামদুলিল্লাহ মন্ত্রী সাহেবের এই বিষয়টি পছন্দ হয়নি। আজকাল ছেলেপিলেদের পুলিশের বিশেষ টিমের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনা বাবা-মাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। সেকুলার সমাজ ভাবে নামায পড়ল তাে ছেলে জঙ্গি হয়ে গেল। তিনি একদিন আমাকে ডেকে তাদের বাসায় যেতে নিষেধ করে দিলেন। আমিও তার কথামতাে সজলের সাথে মেলামেশা কমিয়ে দিলাম। কিন্তু সজল প্রায়ই আমার সাথে যােগাযােগ করে। মন্ত্রী সাহেবের বিষয়টা পছন্দ হলাে না। তিনি আমাকে পথ থেকে সরানাের সকল ব্যবস্থা নিলেন। একদিন অফিসে সুপারিন্টেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আসলেন। আমাকে ধর্ম নিয়ে আলতু-ফালতু অনেক প্রশ্ন করলেন।

এমন-সব কথা বলছিল যে, আমার ইচ্ছে করছিল ব্যাটাকে কষে একটা গালে চটকানা লাগাই। ইচ্ছেটাকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করেছি। তাকে কোনাে জবাব দিলাম না। ধৈর্য ধরলাম। উনি এটাকেও আমার বেয়াদবি ধরে নিলেন। সাস্পেনশন অর্ডার দিয়ে দিলেন। যারা তােকে চেনে, তার সঙ্গে কাজ করে, তারা তাে তাের স্বভাব-চরিত্র জানে। তারা কিছু বলল না? তারা তাে জানে তুই কেমন। রায়হান নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কেউ আমার পক্ষে কিছু বলেনি। আমার সাস্পেন অর্ডার হওয়ায় অনেকেই খুশি। অনেকেই আছে, আমাকে দেখতে পারে না। হুম। তােকে দেখতে পারার তাে কোনাে কারণ দেখছি না। আমাকে শাে-কজ করেছিল। শােকজের জবাব দিয়েছি। জবাব ওদের পছন্দ হয় নাই। অনেকেই বলেছে আমাকে ডিসমিস করে দেবে। শােকজে কী লিখেছিলি? রায়হান কোনাে জবাব না দিয়ে আবারও উদাস হয়ে গেল। কথা বল গাধা! রায়হান চুপ করে রইল। আমি বিরক্ত গলায় বললাম, ওদের কোনাে দোষ দিচ্ছি। । আমি তাের বস হলে এবং সেকুলার হলে তুই যে ভাব নিয়ে থাকিস, তাতে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই অনেক আগে তােকে ডিসমিস করে দিতাম।

অন্য পোস্ট: বােরকার নিন্দা করবাে না

কবে শাে- কজ করেছে

কবে জবাব দিয়েছিস? রায়হান শুধু ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। আমি জবাবের জন্যে অপেক্ষা করলাম । চা খাবার জন্যে রওনা হলাম। রায়হান ক্ষীণস্বরে বলল, অনেক আজেবাজে কথা শাে-কজে লিখেছে। আমি নাকি কাজ জানি না, ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িত আছি বলে তাদের সন্দেহ, একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপােষকতায় কাজে ঘাপলা করছি। আরও অনেক মিথ্যা। মনটা খারাপ হয়েছে। আমি চুপ করে রইলাম। চুপ করে থাকলে রায়হান নিজেই কথা বলবে। রায়হান বলল, এখন চাকরিটা গেলে তারপরই আমাকে গুম করা হবে আর তা না হলে পুলিশ ভাইরা হাজতে নিয়ে বড় কোনাে সংগঠনের সাথে নাম জুড়ে দিতে পারে। এটা কোনাে সমস্যা না। সমস্যা হলাে মা অসুস্থ, ছােট ভাইটা একাকী মায়ের দেখাশােনা … রায়হান কথা শেষ করল না। মাঝে মাঝে সে কথা শুরু করে, যেই মুহূর্তে মনে করে বেশি কথা বলছে, সেই মুহূর্তে চুপ হয়ে যায়। কথা আর শেষ করে না। আমি বললাম, আমি তাে তােকে এখন ভালাে একটা নাস্তা করানাে ছাড়া এই ব্যাপারে আর বেশি কিছু করতে পারব না। তুই দোয়া করবি। তাের দোয়া খুব কাজে লাগে।

আল্লাহ তাের দোয়া কবুল করেন। চায়ের টেবিলে মুখােমুখি বসলাম। দুজনের নাশতা দিতে বললাম। রায়হান, এই সপ্তাহেই তােদের বাড়িতে যাব। তােদের বাড়ি তাে শীতলক্ষ্যার পাড়ে, তাই না। পূর্বাচলে না? রায়হান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তােদের ওইখানে তাে ড্রেজার দিয়ে নদীর পাড় সব ভরাট করে ফেলা হচ্ছে, তাই । আর নদীর একদম কাছে না তােদের বাড়ি? রায়হান আবার হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তােদের বাড়ির পাশে নদী লাগােয়া এতিমখানা মাদ্রাসাটা নিশ্চই আছে। হুম। তুই এক কাজ করতে পারবি? এতিমখানার সামনে, নদীর কাছে বালিতে অস্থায়ীভাবে দুজনার জন্যে দুইটা ছাউনি তৈরি করতে পারবি? ছােট করে পাতার ছাউনি করবি। চারপাশ খােলা থাকতে হবে। একটা ছাউনিতে যাতে একজনার বেশি বসা না যায় এমন দুইটা ছাউনি পাশাপাশি। কাজটা করতে হবে পূর্ণিমার আগের দিন। রায়হান বিরস গলায় বলল, আচ্ছা। অস্থায়ী পাতার ছাউনি কেন করতে হবে, কী ব্যাপার, কিছুই জিজ্ঞস করল না। কী অদ্ভুত একটা ছেলে! পূর্ণিমার দিন তার বাড়িতে উপস্থিত হলে দেখা যাবে সে ঠিকই এতিমখানার সামনের তীরে দুটো ছাউনি তৈরি করে রেখেছে। পরােটা-ভাজি দিয়ে গেছে। রায়হান খাচ্ছে। কিন্তু জোর করে খাচ্ছে। অর্থাৎ বাড়ি থেকে নাশতা করে বের হয়েছে। ভাের রাতে রওনা না হলে এত সকালে কেউ ঢাকায় পৌছাতে পারে না।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-১

এত ভােরে কে তাকে নাশতা বানিয়ে দিয়েছে? তার ছােট ভাই? রায়হানের বউ মারা গেছে। বাসায় আছে ছােট ভাই—জহির। অসম্ভব মেধাবী আর বুদ্ধিদীপ্ত একটি ছেলে। সবাইকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে। প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে একবার রায়হানের কাছে গিয়েছি। তার ভাই আনন্দিত গলায় বলল, মাথাব্যথা করছে আমাকে বলেননি কেন? আমার বন্ধুর কাছ থেকে একটা মাথার ম্যাসেজ শিখেছি। অসম্ভব কার্যকরি, দু-মিনিটে ব্যথা উধাও হয়ে যাবে। দেখি মাথা নিচু করুন তাে ভাইয়া। কোনাে এক অদ্ভুত কারণে দুই ভাই একসাথে থাকতে পারে । মাঝে মাঝে দুই ভাইয়ের মধ্যে মনােমালিন্য হয়। ছােট ভাই তাই বেশির ভাগ সময়ই মামাদের বাড়ি থাকে। রায়হানকে জিজ্ঞেস করে কোনাে লাভ হবে না জানি, তারপরও জিজ্ঞেস করলাম, তাের ভাই কি তাের সাথে আছে, না মামা বাড়ি? মামা বাড়ি। আসে না তাের কাছে? রায়হান উত্তর দিল না ফোঁস করে আবার নিঃশ্বাস ছাড়ল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *