December 6, 2021
alien by banglabbcnews

জ্বিনদের এবাদত

Read Time:15 Minute, 12 Second

ছাত্র উস্তাদদের অভাব

২০০৮ সালের ঘটনা। আমি তখন চট্টগ্রাম জেলা ফটিকছড়ি উপজেলার জামিয়া ইসলামিয়া ওবায়দিয়া নানুপুরের ছাত্র । সেই মাদরাসাটি তালিমতাবলীগের মার্কাজ। সেখানের ছাত্র উস্তাদদের আমল আখলাক অনেক উন্নত। যারা কখনাে সে মাদরাসাটি দেখেননি অবশ্যই প্রথম দেখলে অবাক হবেন । এমন পল্লি গ্রামে এত বড় মাদরাসা! সেখানে ছাত্র উস্তাদদের না কোনাে আসবাবের অভাব আছে । না আমলের অভাব আছে। যেখানে শুয়ে আছেন যমানার দুই কুতুব। আমরা যখন পড়াশুনা। করি তখন পীরে কামেল আল্লামা শাহ জমীর উদ্দীন (রহ.) জীবিত ছিলেন। সেখানে তালিমের সাথে তাবলীগের কাজ খুব জুড়ালােভাবে হয় ।

মসজিদে পাঁচ কাজ চালু আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার ২৪ ঘন্টার জন্য তালেবে এলেমরা তাবলীগে বের হয়। তেমনিভাবে রমজান মাসের বন্ধের আগে শাবানের বার্ষিক পরীক্ষার শেষে ৪০ দিনের একচিল্লার জন্য বের হয়ে যায়। অনেক ছাত্ররাই একচিল্লার জন্য তাবলীগে বেরিয়ে যায়। এমনকি অনেক জামাতে উস্তাদও থাকে। আমার ইচ্ছা না থাকা সত্যেও আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা । আমিও এক জামাতের সাথে তাবলীগে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়ে ফেলি । আমি যে জামাতে নাম লিখাই সে জামাতটি নানুপুর মাদরাসা থেকে কাকরাইল মসজিদে চলে যায় । আমি বাড়িতে চলে আসি ।

আমাদের জামাতের যিনি আমীর ছিলেন তিনি আমাকে তশকিল করেছেন তাবলীগে যাওয়ার জন্য। তাই তিনি আমাকে বারবার ফোন দিচ্ছেন। ঢাকা কাকরাইল চলে যাওয়ার জন্য। আব্দুর কাছেও বলতে পারছিনা রমজানে তাবলীগে সময় কাটাবাে। কারণ, তিনি রমজানে তারাবী নামায না পড়িয়ে তাবলীগে সময় লাগানাে পছন্দ করবেন না। আমাদের আমীর আব্দুর রউফ ভাই এর তাগিদে আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে ঢাকা কাকরাইলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম । চট্টগ্রাম। নানুপুরের ছাত্ররা এক জায়গাতে আছেন। আমিও কাকরাইল মসজিদের ওই স্থানে পৌঁছলাম ।

মুরব্বিরা এক জামাতে ১৪/১৫ জন সাথী দিয়ে গ্রুপ করে রুখ দিচ্ছেন। আমি যে জামাতে পরলাম আমাদের আমীর বানিয়ে দিলেন আব্দুর রউফ ভাইকে। তিনি ইন্টার পাশ করার পর তাবলীগে সময় লাগিয়েছেন অনেকদিন। সে তাবলীগ থেকেই তিনি মাদরাসায় পড়ার ইচ্ছা হলাে । জেনারেল পড়া বাদ দিয়ে মাদরাসায় ভর্তি হলেন । আমাদের জামাতের সাথী হলাে মােট ১৮ জন । আমরা ১৪ জন মাদরাসার ছাত্র, বাকি ৪জন এর মাঝে দু’জন বৃদ্ধ, দু’জন যুবক । আমাদের জামাতের। রুখ দেয়া হলাে পিরােজপুর জেলার স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) উপজেলা ইউনিয়ন। আমরা কাকরাইল মসজিদ থেকে রওয়ানা হলাম সদরঘাট।

আরো পড়ুন: পাপ থেকে আত্মরক্ষা

সেখান থেকে পিরােজপুরের উদ্দেশ্যে আমরা মাগরিব নামাযের সময় লঞ্চে উঠলাম । সে রাতটা ছিল শবে বরাতের রাত্র । আমার জীবনের প্রথম এত বড় লঞ্চে উঠা । সারা রাত্র লঞ্চে কাটানাের। আনন্দটাই অন্য রকম। তিন তলা বিশিষ্ট লঞ্চ এর ভিতরেই হােটেল রয়েছে, ঘুমানাের স্থান রয়েছে । এর উপর তলায় অথ্যাৎ ছাদে রয়েছে এক বিশাল যেন এক খেলার মাঠ। সেখানে আমরা সবাই ইশার নামায পড়লাম। সেখানে একজন আলেম শবে বরাতের ফজিলত নিয়ে আলােচনা করলেন । রাতের খােলা আকাশ, তারার জলমল । বিশাল সাগরের পানির ছল ছল, ঢেউয়ের তালে তালে লঞ্চ চলছে তার আপন গতিতে। আমরা এ সুন্দর বিশাল আকাশ ও সাগর দেখে ভাবতে লাগলাম আমাদের প্রভুর সৃষ্টি। যদি হয় এত সুন্দর, এত বিশাল! না জানি আমাদের প্রভু সৃষ্টিকর্তা কত সুন্দর, কত বিশাল?

বিছানায় শুয়ে আল্লাহর কুদরত নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম । যখন ঘুম ভাঙ্গল ফজর নামাযের শেষ ওয়াক্ত। আমীর সাহেব। ডাকলেন সাথীরা সবাই তাড়াতাড়ি উঠুন। অজু করে নামায আদায় করে। নিন। ততক্ষণ লঞ্চও আমাদের গন্তব্যের তীরে ভিরছে। আমরা নামা। শেষে লঞ্চ থেকে নামলাম। সেখান থেকে আমরা স্বরূপকাঠি উপজে মার্কাজ মসজিদে গেলাম। সেখানে আমরা দুই দিন অবস্থান করার প সেখানের মুরুব্বিরা আমাদেরকে ইন্দারহাট বাজারের উত্তর পাশে । মসজিদে প্রথম রুখ দিলেন। সেখানে আমরা সকালে উপস্থিত হলাম। আমাদের রুটিন অনু” মাশুওয়ারা, দাওয়াত-তালীম, গাশত, ঈমান-ইয়াকিনের বয়ান ওসারা 

দিনের আমল শেষে এখন রাতের খাবার ও ঘুমের পর্ব। খাবার শেষে সবাই যার যার বিছানায় শুয়ে পড়লাে। মসজিদ ছােট ও সাথী বেশি হওয়াতে পুরাে মসজিদেই সাথীদের বিছানা করতে হলাে। ঘুমের আদব অনুযায়ী সবাই ঘুমের ঘরে লুকিয়ে গেলাে ।। যখন তাহাজ্জুদের সময় হলাে এক এক করে সকল সাথীরা ঘুম থেকে উঠতে লাগলাে । অজু করে নামাযের বিছানায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সালাতুল তাহাজ্জুদ আদায় করছে। কেউ কেউ সালাত আদায় করে দুটি হাত আল্লাহর দরবারে বাড়িয়ে দিয়েছেন । চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়ছে ।

প্রভুর কাছে। প্রার্থনা করছে, গােনাহ মাফ চাচ্ছে, এলেম চাচ্ছে, আমলের স্বাদ চাচ্ছে। চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছে। এভাবে আমলের মাঝে ফজরের আযান। হলাে। এরপর ফজরের নামায জামাতে আদায় হলাে। একজন সাথী দাড়িয়ে ৬ নাম্বারের বয়ান করলাে। কালিমা, নামায, ইলেম, জিকির, সহিনিয়ত, দাওয়াত ও তাবলীগের বয়ান শেষে গাশতে বের হলাম । মহল্লার সাথীদের দাওয়াত দিলাম । যারা নামায পড়ে না তাদেরকে নামাযের কথা বললাম। গাশত শেষে আমরা সব সাথীরা মসজিদে আসলাম। আমীর সাহেব সবাইকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ হলাে। শেষে এক সাথী বলে উঠলােআমীর সাহেব! একটা কথা বলতে অনুমতি চাই ।

অন্য পোস্ট: বােরকার ভেতর যখন আধুনিক তরুণী

বলুন- কি বলতে চান? আজ রাতে আমার ঘুম কম হয়েছে । ঘুমের মধ্যে সমস্যা হয়েছে। ঘুমের মধ্যে কি সমস্যা হয়েছে? ঘুমের মাঝে কে যেন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকে, বলে উঠুন! উঠুন! কিন্তু জাগ্রত হয়ে কাউকে দেখিনা । ঘুমিয়ে পড়ি। আবার কে যেন মাথায়। হাত বুলিয়ে উঠুন উঠুন বলে ডাকছে। এভাবে অনেকবার । কিন্তু উঠে কাউকে দেখিনা। এমনি আরেকজন সাথী বলে উঠলাে- আমাকেও কে জানি এভাবে অনেক ডাকাডাকি করছে।

এভাবে অনেক সাথীরা বললাে- আমাদেরকেও অনেক ডাকাডাকি করেছে। কিন্তু উঠে কাউকে দেখিনা। তখন আমীর সাহেব বলে উঠলো। আমি বুঝতে পেরেছি। এখন আমাদের কোনাে সাথীরা ডাকাডাকি করে আপনাদের ঘুম নষ্ট করেনি। একজন সাথী বললাে- তাহলে এ কাজ কে করেছে? আমি বলছি- শােনুন, দেখুন মসজিদের আশপাশ কেমন ঝােপঝাড় ভরা  কি নিরব নিস্তদ্ধ এলাকা। এমন নিরিবিলি মসজিদে অন্য একটা জাতি রাতের আঁধারে এবাদত করতে আসে। তারা হলাে, জ্বিনজাতি । তারা। আল্লাহর এবাদত করে। তারা ভালাে জ্বিন । আমাদের কোনাে ক্ষতি করবে। না। মানুষের মধ্যে যেমন ভাল খারাপ আছে, তাদের মধ্যেও আছে । তাই। আমি বলবাে, আজ রাতে আমরা ঘুমানাের সময় মসজিদের মেহরাবের। বরাবর কেউ শুইবাে না। তাদের এবাদতে আমরা কেউ ডিস্টার্ব করব না।

প্রিয় পাঠক! ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ নয় । আমাদের সেদিন রুটিন অনুযায়ী সারা দিন কেটে যায়। আবার পরের রাত আসলাে ঘুমানাের পর্ব । সবাই মেহরাব বরাবর জায়গা খালি রেখে নিজ নিজ বিছানায় করে শুয়ে পড়লাে । তবে মােশারফ নামে এক সাথী ভাই তিনি এস্তেঞ্জায় ছিল। তিনি পরে মসজিদে এসে দেখলাে সব জায়গাতে অন্য সাথীরা শুয়ে পড়ছে। শুধু মসজিদের মধ্যের জায়গাটা খালি। অন্য জায়গায় আবার ফ্যানও নেই । আগের রাতের ঘটনা ও আমীর সাহেবের নিষেধ তিনি ভুলে গেছেন। তাই তিনি মেহরাব বরাবর মসজিদের মধ্যে বিছানা করে শুয়ে পড়লেন।

রাতে কিছু সময় যেতে না যেতেই পূর্বের রাতের মত ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেল । মােশারফ ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকছে ভাই! উঠন। আরো সুন্দর ভাষায়, ভাই আমরা এবাদত করবাে আপনি দয়া করে উঠুন। মােশারফ ভাই চোখ মেলে কাউকে না দেখে আবার ঘুমিয়ে যায়। আবা। ডাকে, এভাবে বারবার ডেকে জাগ্রত করে আর তিনি ঘুমিয়ে যায়। এভাবে মােশারফ ভাইকে জাগাতে বা এখান থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়ে কৌশল অবলম্বন করলাে। আমাদের আমীর সাহেব আব্দুর রউফ ভাইকে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকছে আর আমীর সাহেবকে বলছে- আপনার সাথীকে এখান থেকে সরিয়ে নিন। আমরা নামায পড়বাে, আল্লাহর এবাদত করবাে। তবে নতুন কৌশলেও কোনাে কাজে আসছে না ।

আমীর সাহেবও অন্য সাথীর মতই সজাগ হয়ে কাউকে না দেখে আবার ঘুমিয়ে যায়। বারবার সজাগ করালে ঘুমের ভারে আর উঠতে পারে না ।। এবার জ্বিন সাহেব রাগান্বিত হয়ে আরেকটা কৌশল বের করলাে । জ্বিন আমীর সাহেবকে ডাকছে আর রাগান্বিত স্বরে বলছে, আমীর সাহেব! আপনি যদি আপনার সাথীকে এখান থেকে সরিয়ে না নিন, তাহলে আমরা তাকে মসজিদ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবাে। এমন কঠিন ভাষায়েও আমীর সাহেবের ঘুম ভাঙ্গেনি । তিনি ঘুমে বিভােড় ।। হঠাৎ মসজিদের দরজা খােলার আওয়াজে আমীর সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি লাফ দিয়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে দেখলেন মােশারফ ভাই মসজিদের বাইরে চলে যাচ্ছেন । তখন আমীর সাহেব ডাক দিলেন মােশারফ ভাই! আপনি কোথায় যান? ঐ তাে আমীর সাহেব আমাকে ডাকছেন, আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমীর সাহেব মােশারফ ভাইয়ের হাত ধরে বললাে- ঐ বাহিরে কাকে দেখেন? আমি তাে এখানে, আপনার সাথে । আমীর সাহেব মােশারফ ভাইকে মসজিদের ভিতরে এনে লাইট জ্বাললাে । তখন মােশারফ ভাইয়ের ঘুমের ক্লান্তিটা কাটলাে। তখন মােশারফ ভাই বললাে- আমি দেখলাম আপনি পাঞ্জাবী পড়া, মাথায় পাগড়ী পড়া অবস্থায় আমাকে বাহিরে যাওয়ার জন্য ডাকছেন। আর এখন দেখি আপনি গেঞ্জি পড়া মাত্র ঘুম থেকে উঠলেন, এর আগেও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে অনেকবার ডেকেছেন । আমি আপনাকে ডাকিনি । জ্বিন আপনাকে ডেকেছে। গতকাল বলেছিলাম। না মেহরাব বরাবর বিছানা না করতে? তবে জ্বিনে আজ আমাকেও

কিশাের ডেকেছে আপনার জন্য। আপনাকে বারবার ডাকার পরও আপনি এখান থেকে না উঠার কারণে। তাই জ্বিন রাগ করে আমার বেশ ধরে আপনাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আল্লাহ হেফাজত করেছেন। হৃদয়ের আহ্বান : প্রিয় পাঠক! আমাদের দেশে অনেক মানুষ জ্বিনজাতি আছে তা বিশ্বাস করে না। এটা অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন-“মানুষ ও জ্বিনজাতিকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার এবাদতের জন্য”। এতে বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টি করেছেন, পাশাপাশি জ্বিন জাতিকেও সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালার এবাদতের জন্য। এ দু’জাতির হিসাব নিকাশ নেবেন। এ দুই জাতির জন্যই রেখেছেন জান্নাত ও জাহান্নাম । জিন জাতির মধ্যেও ভালাে-খারাপ, হিন্দু-মুসলমান, আলেম উলামা ও পীর মাশায়েখ আছে ।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post সৃজনশীল পদ্ধতি সৃজনশীল
banglabbcnews Next post বিল গেইটস ও ররি শংকরের সময় ব্যবস্থাপনা