poor girl-bangla bbc news

দাসীর বেশে

বাংলাদেশ
Spread the love

আউলিয়া কেরামের দেশ হিসেবে পরিচিত একটি দেশ ইরাক। সে দেশের অনেক ওলী বুজুর্গদের নাম শুনেছি। যেমন- হযরত মালেক ইবনে দিনার, মুহাম্মদ বিন হুসাইন বাগদাদী, হযরত বিশর হাফসী, সালেহ মাযানী, আবু হাতেম সাজস্থানী, মারুফ কারসী প্রমুখ । এ বুজুর্গদের সময় যেমন পুরুষ বুজুর্গ ছিলেন তেমন নারীরাও আল্লাহ ওয়ালা ছিলেন। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন বারিয়া আদভিয়া, সাহওয়ানা, মাইমুনাহ প্রমুখ । ঐ সময়ের এক বুজুর্গ নারীর একটি ঘটনা। সে ছিল কিশাের দাসী । ঐ সময় দাসীরাও যে আল্লাহওয়ালা ছিল তার প্রমাণ নিমের ঘটনাটি। ঘটনাটি বর্ণনা করেন হযরত শায়েখ মুহাম্মদ বিন হােসাইন বাগদাদী (রহ.)। তিনি বলেন, আমি এক বৎসর হজ্জ করতে গিয়ে কোনাে কারণে মক্কার এক বাজারে গেলাম। সেখানে দেখতে পেলাম একজন বৃদ্ধ মানুষ এক দাসীকে বিক্রয় করছে। আমি দাসীর নিকটে যেয়ে দেখলাম দাসীর দেহটা একেবারেই জীর্ণ-শীর্ণ, গায়ের রং বিবর্ণ । কিন্তু চেহারাতে যেন জান্নাতী নুর চমকাচ্ছে । আলােয়ে জলমল করছে । রহমতের পানি টলমল করছে । বৃদ্ধ ঐ দাসীর মূল্য হিসাবে বিশ দিনার দর করতেছিল। এ সময় আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোনাে অপরাধে এ দাসীকে বিক্রয় করতে চাও?

সে বললাে- দাসীটা পাগল হয়ে গেছে। সে কারাে সাথে কোনাে কথাবার্তা বলে না । সে প্রতিদিন রােযা রাখে, সারাদিন সে কি যেন ভাবতে থাকে আর ঘুম বিহীন ইবাদত করে রাত কাটিয়ে দেয়। বৃদ্ধ লােকটির কথা শুনে আমার মনে হলাে এ কিশােরী দাসী পাগল নয়। তাই আমি তাকে বিশ দিনার দিয়ে দাসী ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে আসলাম । আমার বাড়িতে এসে সে মাথা নিচু করে রইল । দীর্ঘ সময় এভাবে থাকার পর মাথা তুলে আমাকে বললাে- হে আমার ছােট মালিক! তুমি কোথাকার অধিবাসী? আমি বললাম, আমি ইরাকের অধিবাসী। সে আবার জিজ্ঞেস করলাে- ইরাকের বসরা অঞ্চলে না কুফা অঞ্চলে? আমি বললাম, কুফা বা বসরার কোনাে অঞ্চলেই নয়। দাসী এবার বললাে- তবে নিশ্চয় তুমি মদিনাতুল ইসলাম’ অর্থাৎ বাগদাদে বসবাস কর। তুমি বড় ভাগ্যবান, কেননা বাগদাদ হলােআবেদ ও জাহেদগণের শহর। আমি দাসীর কথা শুনে অবাক হলাম। কারণ, তারা তাে ঘরের কোনায়। অবস্থান করে, মানুষের সেবা করে, আওলিয়াগণের খােজ-খবর রাখা তাদের কাজ নয়। আমি তাকে বললাম তুমি আল্লাহ ওয়ালাদের মধ্যে যাদেরকে চিন তাদের। নাম বল তাে দেখি? সে বলতে লাগল- হযরত মালেক বিন দিনার, বিশর হাফী, সালেহ মাযানী, আবু হাতেম সাজস্থানী, মারুফ কারখী, মুহাম্মদ বিন হােসাইন বাগদাদী এবং রাবিয়া আদভিয়া, সাহওয়ানা, মাইমুনাহ প্রমুখ । আল্লাহ। ওয়ালাগণকে আমি চিনি। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কিভাবে এ সকল বুজুর্গ ব্যক্তিদের পরিচয় লাভ করলে? | সে বললাে- হে যুবক! তারা হলেন- মানুষের আত্মার চিকিৎসক, আল্লাহর আশেকদের পথ পদর্শক । তাদেরকে না চিনলে আর কাদেরকে চিনবাে? আমি বললাম- হে দাসী! আমি মুহাম্মদ বিন হােসাইন। সে সাথে সাথে বলে উঠলাে-হে আবু আব্দুল্লাহ! আমি তােমার সাক্ষাত পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম। কিন্তু তােমার সেই মিষ্টি আওয়াজের কি হলাে যা শশানে শ্রোতাদের চোখে পানি আসতাে? মুরীদদের মুর্দা দিল জিন্দা হতাে? আমি বললাম- তা আগের মতই আছে। দাসী এবার আনন্দিত হয়ে বললাে- তােমাকে আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে বলছি, আমাকে একটু কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করে শােনাও। আমি তেলাওয়াতের উদ্দেশ্যে | পাঠ করতেই সে এক বিকট আওয়াজে চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফললাে। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরে আসলাে। আমি তাকে কালামে পাকের বিভিন্ন স্থান হতে কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করে শুনালাম। সে মাঝে মাঝে আমার তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাৎপর্যের উপর আলােকপাত করতাে। সব শেষে দাসী আমাকে জান্নাতের হুরদের কথা স্মরণ করিয়ে বললাে- হে আবু আব্দুল্লাহ! তাদের মহর বাবত কিছু সংগ্রহ করে লও। আমি বললাম- তাদের মহর কি আমাকে বলে দাও । আমার নিকট তাে কিছুই নেই। সে বললাে- “সব সময় বেশি বেশি নফল রােযা, রাতের বিনিদ্রা ইবাদত ও ফকির মিসকিনদের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি হলাে তাদের মহর।” এ কথা বলে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাে। আমি তার চোখে মুখে পানি ছিটালাম । সে জ্ঞান ফিরে পেয়ে মুনাজাত করতে লাগল। মুনাজাত করতে করতে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেললাে। আমি তার নিকটে গিয়ে দেখলাম, তার প্রাণ ত্যাগ করেছে। সে আর এ জগতে নেই। তার মৃত্যুতে আমার মনটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলাে। সে তাে আল্লাহর ডাকে সারা দিল । আমি তার কাফনের কাপড়ের জন্য বাজারে গেলাম। কিন্তু বাজার থেকে ফিরে এসে দেখলাম অবাক কাণ্ড, কি আশ্চর্য! তার শরীরে কাপড় জড়ানাে । তাকে জান্নাতী কাপড় দ্বারা কাফন পড়ানাে হয়েছে। তার দেহ থেকে তীব্র খুশবাে ছড়াচ্ছে । আরাে আশ্চর্য ও মজার ব্যপার হলাে- তার কাফনের উপর আরবীতে দুটি লাইন লেখা আছে। উপরেরটি হলাে-কালিমায়ে তাইয়্যবাহ আর নিচেরটি হলাে এই- যার অর্থ আল্লাহর ওলীদের জন্য ভয়ের কোনাে কারণ নেই। পরে আমি লােকজন ডেকে এনে তার নামাযে জানাযা ও কাফন দাফনের ব্যবস্থা করলাম । কবর দিয়ে তার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে আমি সূরা ইয়াছিন তেলাওয়াত করলাম । কবরস্থান থেকে চলে আসলাম। এ দাসীর জন্য আমার বুক ফেটে কান্না আসতে লাগলাে। আমি হু হু করে কিছুক্ষণ কাদলাম । দীর্ঘ সময় আমার চোখে অশ্রু বর্ষণের পর তার জন্য দু’রাকাত। নামায পড়ে শয়ন করলাম । ঐ ঘুমে আমি তাকে স্বপ্নে দেখতলাগলাম, সে জান্নাতের লেবাস পড়ে জান্নাতের বিভিন্ন নাজ-নেয়ামতের মধ্যে বিচরণ করছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম-তুমি কোন্ আমলের কারণে এ মর্যাদার অধিকারী হয়েছে? সে বললাে- ফকীর মিসকীনদের প্রতি ভালােবাসা, অধিক এস্তেগফার ও মুসলমানদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেয়ার কারণে আমি আজ এ মর্যাদার অধিকারী হয়েছি। হৃদয়ের আহ্বান : হে প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরাও কি পারিনা তাদের মত বুযুর্গ আল্লাহ ওয়ালা হতে? বেশি করে আমল করতে? আখলাক সুন্দর করতে? ইচ্ছে করলে আমরাও পারবাে। হে কিশাের-কিশােরী! আমরা এখন থেকেই আমল শুরু করে দেই। হে মা-বােনেরা! এ ঘটনায় দেখলেন তাে একজন নারী আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য কতটুকু হাসিল করেছেন। আবার দাসী হয়ে কিভাবে আমল করেছেন? আমরা তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের পথ অনুসরণ করার দরকার । আল্লাহ রাব্বল আলামিন আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমীন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *