বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল

আজ অনেকদিন পর

পুরােনাে ডায়েরিটা খুলে বসেছে নিহিন। অভিমানে যা খােলা হয়নি বহুদিন। কলরবের প্রত্যেকটা চাহনির কথা লেখা আছে এ ডায়েরিতে, আছে নিহিনের প্রত্যেকটা দীর্ঘশ্বাসের কথা। রাগ, অভিমান, অপমান ও দুঃখের জল গড়িয়ে পড়ছে নিহিনের চোখ থেকে। রাগটা আসলে কার ওপর করা উচিত? কলরবের ওপর নাকি বাবার ওপর? নাকি অদৃষ্টের ওপর? তেই পারছে না সে! দিনগুলাের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে নিহিনের। আজ থেকে ১০ বছর আগের কথা। ক্লাস টেনে পড়ত তখন। কলরব পড়ত ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে। বয়সের ব্যাবধানটা নেহাত কম ছিল না। তবুও প্রতিটা বিকেল নিহিনকে দেখার জন্য দুটি চো উদগ্রীব হয়ে থাকত পাশের বাসার বারান্দায়।

প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত হতাে ও, কিন্তু আস্তে আস্তে ভালােলাগাটা কীভাবে যেন চলেই এলাে। একটা সময় এলাে যখন নিহিনও অপেক্ষা করত সে দুটি চোখে নিজেকে সমর্পণ করার জন্য। বৃষ্টি এলেই নিহিন ছাদে যেত ভিজতে, তা দেখে কলরবও যেত তার বাসার ছাদে। চোখে চোখ পড়তেই লজ্জা পেয়ে নেমে আসত নিহিন। নূপুর পায়ে রিনিঝিনি চলার শব্দে কলরব টের পেত নিহিনের অস্তিত্ব। আর ওদিকে কলরবের গিটারের টুং টাং শব্দ যেন জানান দিত অপেক্ষমান দুটি চোখের হাহাকারের কথা। কিন্তু কলরব এত ভীতুর ডিম ছিল যে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শুধু দেখেই গেছে ওকে, কিছু বলার সাহস পায়নি। নিহিনেরই বা কী দায় পড়েছে যে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাবে! কিন্তু এসেছিল, সে দিনটিও একদিন এসেছিল যেদিন কলরব তার ভালােলাগার কথা জানিয়েছিল। নিহিনের জন্মদিনে গান গেয়ে নিহিনকে উইশ করেছিল কলরব।

অন্য পোস্ট: বােরকার নিন্দা করবাে না

উপহার দিয়েছিল এক গাদা চকোলেট আর বেলি ফুলের মালা। সঙ্গে ছিল একটা বিশেষ উপহার.. চিকন একটা নূপুর যার একপাশে একটা হৃদয় আকৃতির সাদা পাথর। সেদিনই শুরু হয়েছিল দুজনের পথ এক হয়ে যাওয়ার। নূপুরটা বের করল নিহিন, অনেক বছর পড়ে ছিল এ ড্রয়ারে। কালচে হয়ে গেছে, পায়ে পরল। প্রথমবার পরিয়ে দিয়েছিল কলরব। কী সাহসটাই হয়েছিল ওর! ভাবলেই এখন গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রাত বারােটার পর টয়লেটে যেতে ভয় পেত যে মেয়ে, সে মেয়ে কি না ছাদের চাবি চুরি করে রাত ১ টার সময় ছাদে গিয়েছিল কলরবের সাথে দেখা করতে! দুটো বাসা অনেক কাছাকাছি ছিল। ছাদের দেওয়াল টপকে এসে পড়েছিল কলরব। তখন মােবাইল ছিল না নিহিনের। আর মােবাইলের প্রয়ােজনও ছিল না অবশ্য। নিহিনের জানালা আর কলরবের বারান্দা তাে ছিলই। রাতের পর রাত কেটেছে চোখে চোখ রেখে, হাজার কথার হাজার স্বপ্ন বুনে। মাঝখানে ছিল শুধু দুটো গ্রিলের বেড়ি। স্বপ্নের মত কেটেছিল সে তিনটি মাস। তারপর ঠিকই নিহিন একদিন ধরা পড়ে গেল বাসায়।

আলতাফ সাহেব নিহিন কে বলেছিলেন, “যা হয়েছে ভুলে যাও। তুমি না জেনেই একটা ভুল করে ফেলেছ। ছেলেটা ভালাে না, আমি খোজ নিয়েছি ওর ব্যাপারে আর কথাও হয়েছে ওর সাথে আমার।” আলতাফ সাহেবের কাছে এর বেশি আর কোনাে প্রশ্নের উত্তর পায়নি সেদিন নিহিন। তাকে ঘর বদলে অন্য ঘরে দেয়া হলাে। কলরবকে ফোন করে পেল না সে, মােবাইল বন্ধ। কলরুলের বারান্দার দরজাটাও বন্ধ থাকত, ১০/১৫ দিন পর নতুন ভাড়াটিয়া এসে বুলেছিল সেই দরজা। কলরবের আর কোনাে খোজ পায়নি নিহিন। কেঁদে ভাসিয়েছিল অনেক রাত। অপেক্ষা। করেছে অনেক দিন। তারপর অভিমানে, রাগে একসময় ভুলেও গিয়েছিল সবকিছু।

আরো পড়ুন: সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-১

কিন্তু আজ আলতাফ সাহেব বললেন, কলরবকে তিনি সময় দিয়েছিলেন! বলেছিলেন, নিহিনের সাথে কোনােরকম যােগাযােগ না করে যদি ওর জন্য অপেক্ষা করতে পারে এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে এসে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তবেই কলরবের সাথে বিয়ে দেবেন নিহিনের! কিন্তু যদি কখনাে কোনােভাবে যােগাযােগের চেষ্টা করে তাহলে তখনই সব শেষ। আর নিহিন যাতে যােগাযােগ করতে না পারে তাই ফোনের সিম, বাসা সবকিছু বদলে ফেলতে বলেছিলেন। এসব কথা আলতাফ সাহেব ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি ওকে। কলরব প্রত্যেকটি কথা মেনে নিয়েছিল, যােগাযােগ করেনি। ঠিকই ৪ বছর পর নিজেকে তৈরি করেই এসেছিল নিহিনকে বিয়ে করতে কিন্তু ততদিনে নিহিনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আসলে আলতাফ নিজেই একসময় কলরবকে দেওয়া কথা ভুলে গিয়েছিলেন, কারণ কলরব যে এতটাই সিরিয়াস তা তিনি ভাবতেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *