বুযুর্গ নারী (পর্ব -১)

শিক্ষা
Spread the love

আগেকার দাসীদের মধ্যে বুযুর্গ, আল্লাহওয়ালা দাসীও ছিল, যারা লখানায় থেকে আল্লাহর আশা থেকে নইরাশ হয় না। যেমন হযরত সাকতী (রহ.) বলেন, একদিন রাতে হঠাৎ আমার মনে পেরেশানী এক হয়ে অস্থির লাগছিল । সেই রাতে আমার কিছুতেই ঘুম আসছে না। বাতের তাহাজ্জুদও ছুটে গেল। ফজরের নামাযের পর মনের পেরেশানী দূর। করার জন্য বাহির হলাম। কিন্তু কোথাও শান্তি পাচ্ছি না। অনেক্ষণ ভাবার পর জামে মসজিদে ওয়াজ শুনতে গেলাম, কিন্তু আমার মনের পেরেশানী দর হচ্ছিল না। হঠাৎ আমার ধারণা হল থানাতে যাওয়ার জন্য, হয়তাে সেখানে যাওয়ার দ্বারা মনে সান্ত্বনা আসতে পারে । কিন্তু সেখানেও কোনাে লাভ হল না। পরে একই উদ্দেশ্যে এক জেলখানায় গেলাম, সেখানে এক সুন্দরী দাসীকে দেখতে পেলাম। হাত কড়া ও পায়ে বেড়ি লাগানাে, সেই দাসীর পরনে ছিল দামী লেবাস এবং তার দেহ থেকে খুশবুর ঘ্রাণ আসতেছিল । দাসীকে প্রথম দেখাতেই মনে হল সে অপরাধী নয়। আমি তার কাছে যাওয়ার সাথে সাথে সে চোখের পানি ছেড়ে কাঁদতে লাগল । আর আল্লাহর কাছে। পার্থনা করতে লাগল । সে বলতে লাগল- হে আমার মালিক! বিনা অপরাধে আমাকে হাত কড়া পড়ানাে হয়েছে। আমার এই হাত কখনাে অন্যায়ভাবে কিছু স্পর্শ করেনি, অথচ তুমি দেখছ বিনা অপরাধে আমাকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। হে আল্লাহ! তােমার নামের শপথ, আমার দিল টুকরা টুকরা করে ফেললেও আমি তােমার আশা থেকে নইরাশ হব না। এই দাসীর করুণ অবস্থা দেখে হযরত সিররী সাকতী (রহ.) বলেন, আমি দারােগার নিকট কয়েদীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলে সে বললাে- এই কয়েদী একজন দাসী । তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তার মালিক তাকে সংশােধনের জন্য জেলখানায় দিয়ে গেছেন। তখন হয়রত সিররী সাকতী (রহ.) বলেন, দাসীকে দেখে কিন্তু পাগল মনে হয় না। দাসী এ কথা শােনে কাঁদতে লাগল । তখন দাসীর কান্না শােনে হযরত সিররী সাকতী (রহ.)ও কাঁদতে লাগল । তখন দাসী বললাে- হে সিররী! তুমি আমার কয়েকটি গুণের কথা শােনেই কাঁদতেছ? যদি তার পূর্ব পরিচয় পাও তােমার অবস্থা কি হবে? এই কথা বলে দাসী জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে প গেল । দীর্ঘ সময়ের পর জ্ঞান ফিরে আসল, তখন আমি তাকে বললাম- হে দাসী। সে জবাব দিল, লাব্বায়েক হে সিররী! আমি তখন বললাম- তুমি কিভাবে আমার পরিচয় পেলে? সে বললাে- যখন আমার মারেফাত হাসিল হয়েছে, তখন থেকেই আমি তােমাকে চিনি। কারণ, আল্লাহ ওয়ালাগণ পরস্পরের পরিচয় পেয়ে। থাকেন। আমি প্রশ্ন করলাম তুমি কাকে ভালবাস? সে জবাবে বললাে- আমি ঐ পবিত্র সত্তাকে ভালবাসি যিনি নিজে অলীগণের সাথে আমাকে পরিচয় করে দিয়েছেন। এ অধমের উপর তিনি অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন । যিনি সর্বজ্ঞানী ও সর্বস্রষ্টা । যিনি পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। যিনি ধৰ্য্যশীলদের উপর প্রতিদান দিয়ে থাকেন । বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিদেরকে দয়া করে থাকেন। আশাহীন ব্যক্তিদেরকে দয়া করে আশা জাগিয়ে তুলেন, এই কথা বলে সে বিকট স্বরে চিৎকার দিয়ে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হযরত সিররী সাকতী (রহ.) বলেন- দাসীর জ্ঞান ফিরে আসার পর, আমি দারােগাকে বললাম- এই নিরিহ বেচারিকে ছেড়ে দাও। দারােগা দাসীকে ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দিল । আমি দাসীকে বললাম- এখন তুমি মুক্ত। তুমি এখন চলে যেতে পার।

তখন দাসী বললাে- আল্লাহ তায়ালা যাকে আমার মালিক বানিয়ে দিয়েছেন, সে অনুমতি না দিলে আমি যাব না। আমি তার নিকট পড়ে থাকব । এমন সময় দাসীর মালিক জেলখানার গেইটে এসে দাঁড়াল এবং বললাে- আমার দাসী তােহফা কোথায়? সে বললাে- ভিতরেই আছে, তার সাথে শায়খ সিররী (রহ.) কথা বলছেন। দাসীর মালিক আমার কথা শুনে খুব খুশি হল। ভিতরে এসে আমাকে মারহাবা বলে অভ্যর্থনা জানালাে ।

তখন আমি তাকে বললাম তােমার দাসী আমার তুলনায় অধিক সম্মান আওয়ার উপযুক্ত। তাকে কি কারণে কষ্ট দিচ্ছেন?

বাবে সে আক্ষেপ করে বললাে- অসামান্য রূপ লাবণ্যের পাশাপাশি এই রাসী ভালাে গানও গাইত। তাকে দিয়ে আমি লাভবান হব এই আশায় বিশ দিরহামের বিনিময়ে আমি তাকে ক্রয় করে ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি কি যে হল, সব সময় উদাস হয়ে বসে থাকে। খানাপিনা একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। নিজেও ঘুমায় না এবং আমাদিগকেও ঘুমাতে দেয় না। হঠাৎ কান্না শুরু করলে আর কিছুতেই থামানাে যায় না। দিনের পর দিন এই অবস্থা চলার কারণে এতক্ষণে তার রূপ-যৌবন ও স্বাস্থ্য একেবারেই ভেঙ্গে গেছে। আমি দাসীর মালিককে বললাম- তার অবস্থা পরিবর্তন কিভাবে হয়েছে? সে বললাে- প্রায় কয়েক বছর পূর্বে একদিন সে বেহালা হাতে নিয়ে বাজারে গান গাইতেছে। হঠাৎ তার কি যে হল সে বেহালাটি ভেঙ্গে হাত থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কান্না করতে লাগল। আমি তার কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম এবং সান্ত্বনা দিয়ে চাইলে সে কিছুই বললাে না । ঐ দিন হতে আজ পর্যন্ত তার অবস্থার কোনাে পরিবর্তন আসছে না। তাই আমার সন্দেহ হয়েছিল সে কারাে প্রেমে পড়েছে কিনা। কিন্তু অনেক অনুসন্ধান করার পরও কোনাে আলামত পেলাম না। তাকে জিজ্ঞাসা করলেও সে কিছুই বলত না। বহুদিন পর সে বললাে- আল্লাহ তায়ালা আমাকে ডাক দিয়েছেন, আমি সেই ডাকে সারা দিয়েছি । অতঃপর অতীতের পাপাচার ও গােনাহর জন্য আমার মনে ভয় সৃষ্টি হয় । কিন্তু আল্লাহ পাকের মুহাব্বতের নিকট সেই ভয়ের পরাজয় হয়। হযরত সিররী (রহ.) বলেন- আমি তােহফার মালিককে বললাম- তাকে আমার নিকট বিক্রি করে দিতে । সে বললাে- তুমি গরীব মানুষ এত টাকা পাবে কোথায়? আমি বললাম- আপনি অপেক্ষা করুন, আমি তার মূল্য এনে দিচ্ছি। আল্লার কসম! আমার কাছে একটা টাকাও ছিল না । আমি ঘরে এসে সারা রাত আল্লাহর দরবারে রােনাজারী করতেছি, আর বলছি হে আল্লাহ! তােমার খাজনায় কোনাে কিছুর অভাব নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *