সন্তানসহ আত্মহত্যা পর্ব-৩

বিনোদন
Spread the love

রিতা তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের কথা তার শিশু-কিশাের সন্তানদের ও জানিয়ে দিল । নিস্পাপ ছেলে মেয়ে অবাক! আম্মু তুমি মরে যাবে? দেরকে কোথায় রেখে যাবে? হয়তাে কান্না জরিত কণ্ঠে বলেছিল, মা কামি মরে গেলে আমরাও মরে যাবাে। ঐ মা-ই জানে এ নিস্পাপ শিশু কিশােরদের কথাগুলাের জবাব তার কাছে কি ছিল!

নে সিদ্ধান্তও নিল কোনাে দিন সে আত্মহত্যা করবে । গত কিছুদিন ধরে আরী রাশেদুলের পক্ষ থেকে কোনাে টাকাও পাঠায় না। টাকা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে । রিতা যে গাড়িটা ব্যবহার করে, সে গাড়িটা রিতা ও তার দু’সন্তান ছাড়া পরিবারের অন্য কেউ ব্যবহার করে না । রিতা ওই গাড়ি নিয়ে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায় । তার গাড়ির ড্রাইভার আল-আমিন। সে গত মাসে রিতার গাড়ি চালক হিসেবে যােগ দিয়েছে।

রিতা গাড়ি চালককে একদিন তার পারিবারিক অশান্তির কথা জানায় । এরপর থেকে আল-আমিন লক্ষ করে রিতার স্বামী রাশেদুল কবির, স্মৃতি ও শ্বশুর বাড়ির চাপে মানসিকভাবে সে বিপর্যস্ত । মায়ের এ অবস্থা দেখে ছেলে পাবন ও মেয়ে পায়েল প্রায় সময় কান্নাকাটি করে। এক পর্যায়ে ওরা দেয়ালে কাগজে বিভিন্ন জায়গা লিখতে শুরু করে। তাদের এ কঠিন অবস্থার জন্য একমাত্র দায়ী করে তাদের বাবা রাশেদুল ও স্মৃতিকে । কি বুঝে শিশু কিশােরটি! মায়ের কষ্ট তাদের সহ্য হচ্ছে না। মায়ের অশান্তিতে তাদের হৃদয় তছনছ হয়ে গেলাে।

এর একদিন পর রিতা তার চালককে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এ কথা কাউকে বলতে পারবে না, সাবধান! এ কথায় আল-আমিন চমকে যায় । বিস্মিত হয়ে যায়! ভয় পেয়ে যায়, কি শুনলাম! | পাবন ও পায়েলের পরীক্ষা চলছে। গাড়ি চালক তাদেরকে স্কুলে থেকে আনা নেয়া করে । আস্তে আস্তে তাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলাে । পরীক্ষার কিছুদিন পরেই তাদের আত্মহত্যার দিনটি ঘনিয়ে এলাে। একেবারে নাগালে । রাত যেয়ে দিন আসে এভাবেই আত্মহত্যার দিন এলাে । রিতার ছেলে পাবন ও মেয়ে পায়েলকে স্কুলে পাঠালাে । তাদের স্কুল ছুটির সময় রিতা নিজেও তাদের স্কুলে গেলাে।

এরপর বিকাল বেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কিছুক্ষণ থেকে সন্ধ্যা দিকে দুই সন্তানসহ একটি চায়নিজ রেষ্টুরেন্টে যান। এ অভিশপ্ত তাদেরকে জানিয়ে দেয় আজকেই তারা আত্মহত্যা করবে। মায়ের সাথে তারাও চলে যাবে ওপাড়ে, তাদের আগের ওয়াদা। আজ তাদের এ পৃথিবীর শেষ দিন। এ অবুঝ শিশুগুলাে কি বুঝে! কিন্তু তাদের বিমিস তুলেছে তাদের মা বা তাদের অভিশপ্ত পরিবার। মা বাবার এ অবস্থায় আসার কারণ হলাে- পিছনে অবৈধ জীবন পরিচালনার ।

তাদের পরীক্ষার আগে এ অবুঝ শিশু একদিন মাকে প্রশ্ন করে, মা! মরে যেহেতু যাবাে পরীক্ষা দিয়ে কি লাভ? এমন অনেক কঠিন প্রশ্নই করে তারা! আজও তাদের মাকে এক প্রশ্ন করলাে- মা! আমরা আজ মরে গেলে আল্লাহর কাছে কি আমরা তিনজন একসাথে থাকবাে? সন্তানদের এসব প্রশ্নের জবাব মা দিতে পারে না । শুধু চোখের অশ্রু ফেলে! | তারা রেষ্টুরেন্টে খেয়ে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরলাে। এর কিছুক্ষণ পর তখন রাত ৯টা রিতা তার গাড়ির ড্রাইভার আল-আমিনকে ঘুমের ঔষধ এনে দিতে বললাে। আল আমিন তাতে আপত্তি জানায়। তাকে পিড়াপিড়ি করা হয় । শেষে রিতার মাইক্রোবাসটি দিয়ে দেয়ার লােভ দেখানাে হয় ।

আলআমিন তার বাড়ির অভাবের কথা চিন্তা করে শেষে ঔষুধ আনতে রাজি হয়। এরপর আল-আমিন বাহিরে গিয়ে ফার্মেসী থেকে ঘুমের বড়ি এনে দেয় রিতার হাতে । রিতা ঔষধ গুলিয়ে দিতে বাধ্য করে। তখন আল। আমিন বড়িগুলাে তাদের সামনে হাজির করে। এ মৃত্যুর জম গুলানাে। ঔষধ আগে পাবন খায় এরপর পায়েল খায়। ঔষধ খাওয়ায় পাবন ও পায়েল ছটফট করতে লাগলাে । পায়েল বমি করছে আর লাফালাফি করছে।

এই করুণ অবস্থা পাষণ্ড মায়ের সামনেই চলছে । মা রিতা তাদের পাশেই আছে । মায়ের চোখের সামনেই দু’টি সন্তান বিছানায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে চিরদিনের জন্য । রিতা বেশ কয়েকবার ডেকে কোনাে সাড়া না পেয়ে কলম নিয়ে ডায়েরীতে লিখতে শুরু করলাে! এ করুণ কাহিনী ড্রাইভার অসহায় চোখে ভিডিও করছে ।

রিতা ডায়েরীতে যা লিখছে-“আমার সত্যিকার অর্থেই কিছু করার ছিল না । ওরা যে ভেতরে এত কষ্ট চেপে ছিল, আমি বুঝতে পারি নাই । মাঝে মধ্যে এদের আচরণে অবাক হতাম পাবন ও পায়েল যে এমন করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। আমি শুধু বলেছি এ পরীক্ষা শেষে, আস্তে আস্তে আমরা এই বাসা ছেড়ে দেব । খুব কষ্ট করে পরীক্ষা দিতে রাজি করিয়ে ছিলাম । আমি জানি, সবাই আমাকে দোষ দেবে। কিন্তু আমি কতটুকু দোষী আল্লাহ জানে। আমার বাসায় থাকাটা ওরা পছন্দ করছিল না। আমি পাবনের মা, আমি কিছু জানতাম না।

আমি যে অবস্থায় লিখছি পৃথিবীর কোনাে শত্রুরও যেন এ অবস্থায় পড়তে হয় না। সবাই ভালাে থাকেন । যত পারেন। আমাকে দোষ দেন। আমার ছেলে মেয়ের সামনে অপমান করেন, বকেন, আমার আর কিছুই গায়ে লাগবে না।” এতটুকু পর্যন্ত ডায়েরীতে লিখে এরপর নিজেও গােলানাে ঘুমের বড়ি খায় এবং এক পর্যায়ে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে । স্তব্ধ হয়ে যায় সব। এরপর রিতার গাড়ির ড্রাইভার আল আমিন তাদেরকে বিছানায় সাজিয়ে গায়ে চাদর দিয়ে দেয়। এরপর রিতার মােবাইল থেকে সিম খুলে নিয়ে মােবাইল ফোন ও পায়েলের লেখা একটি চিরকুট তাদের শরীরের ওপর রেখে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায় ।

সারা রাত লাশ পরে থাকে পরদিন ১১ জুন ২০১০ শুক্রবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পূর্ব জুরাইনের আলমবাগ এলাকা ২২৯ নম্বর তিন তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে পুলিশ ফারজানা কবির রিতা (৩৫) তার ছেলে কবির ইশরাক পাবন (১২) ও মেয়ে রাইসা শারমিন পায়েল (১০) এ তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। হৃদয়ের আহ্বান : প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! তখন সকল পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন রং ছড়িয়ে মজাদার করে । ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াগুলাের ১৫/২০ দিনের ভালাে খােরাক জুগিয়েছে। তবে আলােচনার টেবিলে উঠে এসেছে ঠিক। কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে আলােচনা হয়নি। আলােচনার শেষ পর্যায়ে এসে মিডিয়া তার স্বভাব সূলভ ভঙ্গিতে রাজিয়া সুলতানা স্মৃতির বেলেল্লাপনা ও রিতার স্বামী রাশেদুলের লাম্পট্যর নিন্দা করছে চড়া গলায়।

তাদের উপর সব দোষ চাপিয়ে সব ধরনের নেগেটিভ বিশেষ প্রয়ােগ করে তাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি প্রদান ও ঘটনার স৮ তদন্তের আশাবাদ ব্যক্ত করে রগরগাে বর্ণনার ইতি টানছেন । অথচ অসিল সমস্যা কোথায় তা নিয়ে কেউ আলােচনা করছে না। কেউ প্রশ্ন তুলছে না। যে, ৯০% মুসলমানের এই বাংলাদেশে মুসলিম পরিবারের একটি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ও একটি ছেলে তাদের উপর ইসলাম প্রদত্ত অবশ্য পালনীয় পর্দা প্রথাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে কেন ও কিভাবে নিজেরা পরস্পরে দেখা সাক্ষাত ও খােশ গল্পে মত্ত হচ্ছে? কিভাবে একটি পরিবারের দায়িত্বশীল পিতা, স্বামী, তার মেয়ে ও স্ত্রীকে যাদের সাথে দেখা দেয়াই হারাম। এমন একজন পুরুষের সঙ্গে যথেচ্ছা। দেখা সাক্ষাত এমনকি একটি নির্জন ঘরে তাদের সময় কাটানােকেও সহজে ও অবলীলায় মেনে নিচ্ছে? আর এর কারণেই যে রিতা, স্মৃতি ও রাশেদুলের মত হাজার অঘটন ঘটছে । আল্লাহ তায়ালা আমাদের লেখক পাঠক সবাইকে উপরক্ত বাস্তব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *